ঢাকা , সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬ , ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌন্দর্য হা'রাচ্ছে কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাকিরপশার বিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-৩১ ১৯:৫৫:০২
সৌন্দর্য হা'রাচ্ছে কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাকিরপশার বিল সৌন্দর্য হারাচ্ছে কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাকিরপশার বিল
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-


কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার বিল শুধু একটি জলাশয়ের নাম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের জলপ্রবাহ, কৃষি, মৎস্যজীবী মানুষের জীবন জীবিকা এবং স্থানীয় জনপদের ইতিহাস। কোথাও এটি ‘চাকিরপশার বিল কোথাও চাকিরপশার নদী আবার ভাটির দিকে মরা তিস্তা’ বা বুড়িতিস্তা নামে পরিচিত। রাজারহাটের ইটাকুড়ি এলাকা থেকে শুরু হয়ে এ জলপ্রবাহ উলিপুরের থেতরাই এলাকায় তিস্তা নদীতে গিয়ে মিশেছে।


চাকিরপশার নামের সুনির্দিষ্ট উৎপত্তি নিয়ে প্রামাণ্য লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের ইটাকুড়ি এলাকা থেকে উৎপন্ন হওয়ার পর কয়েক কিলোমিটার অতিক্রম করে জলপ্রবাহটির নাম হয় চাকিরপশার। আরও ভাটিতে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে মরা তিস্তা এবং পরে বুড়িতিস্তা নামে পরিচিত হয়েছে। এ জলপ্রবাহের নাম থেকেই কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নের নামকরণ হয়েছে এমন তথ্য স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। তবে নামটির মূল শব্দ বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি,ঘটনা কিংবা কিংবদন্তির সঙ্গে এর সম্পর্কের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি। চাকিরপশার জলপ্রবাহ রাজারহাট উপজেলার রাজারহাট, চাকিরপশার ও বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার দিকে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত তিস্তা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। হাইকোর্টে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এর উজান অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার এবং ভাটি অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করেছে। চাকিরপশার বিলের আয়তন নিয়ে বিভিন্ন


সরকারি চিঠি, ভূমি রেকর্ড ও সংবাদ প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে তথ্য অনুযায়ী বিলটির আয়তন ২৮৩ দশমিক ২৮ একর। অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভিন্ন সময়ে দেওয়া চিঠির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিলটির আয়তন কখনো ৩০৬ একর, আবার কখনো ২৭৯ একর উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার বিলের আয়তন ২৮৩.২৮ একর বলা হলেও পুরোনো রেকর্ড ও প্রশাসনিক নথিতে ভিন্ন পরিমাণ থাকার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। চূড়ান্ত আয়তন নির্ধারণে সর্বশেষ সরকারি জরিপ ও ভূমি রেকর্ড যাচাই প্রয়োজন। চাকিরপশার এলাকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় ব্রিটিশ আমলের ভূমি রেকর্ডে। প্রকাশিত ভূমি-রেকর্ডভিত্তিক তথ্যে বলা হয়েছে, ১৯৪০ সালের সিএস রেকর্ডে চাকিরপশার এলাকার জলাভূমিকে বিল শ্রেণি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। পাঁচটি মৌজার ছয়টি খতিয়ানে মোট ২৫৯.৪৫ একর জমি এ শ্রেণিতে ছিল। অন্যদিকে স্থানীয় ইতিহাস ও নদী সংক্রান্ত প্রতিবেদনে চাকিরপশারকে শত বছরের পুরোনো পানির প্রবাহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানের বিলটির সঙ্গে শুধু সাম্প্রতিক জলাশয় ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক নয় দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। চাকিরপশারের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যের একটি হলো এর মৎস্যসম্পদ। বর্ষাকালে তিস্তার সঙ্গে সংযোগের কারণে এ জলপ্রবাহে পানি ও মাছের চলাচলের সুযোগ ছিল। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে চাকিরপশার বিলকে মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত জলাভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জলপ্রবাহের সঙ্গে সংযোগ থাকায় এটি শুধু মাছ ধরার স্থান নয়,মাছের প্রজনন ও বিচরণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ, রাস্তা, দখল ও জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চাকিরপশারের বর্তমান সংকটের পেছনে আশির দশকের বিভিন্ন অবকাঠামো ও জলাশয় ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে।


রাজারহাটের পাঠানহাট এলাকায় আশির দশকে চাকিরপশারের ওপর পানিপ্রবাহের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা ছাড়া রাস্তা নির্মাণ করায় স্বাভাবিক পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে জলপ্রবাহের বিভিন্ন অংশে বাঁধ,পুকুর ও দখলের কারণে বিলটির স্বাভাবিক চরিত্র আরও পরিবর্তিত হয়। একপর্যায়ে এটি বদ্ধ জলমহাল হিসেবে ইজারার আওতায় আসে। চাকিরপশারকে বদ্ধ জলমহাল হিসেবে একটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আদালতের দ্বারস্থ হয়। ২০২৩ সালে হাইকোর্ট চাকিরপশার বিল কোনো ব্যক্তি বা সমিতির অনুকূলে ইজারা বা বন্দোবস্ত দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। একই সঙ্গে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদসহ বিভিন্ন বিষয়ে রুল জারি করা হয়। চাকিরপশার শুধু মাছের উৎস নয়; এটি আশপাশের কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। জলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে বর্ষায় পানি আটকে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনার ওপরও এর প্রভাব পড়ে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে চাকিরপশারের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার সমস্যা এবং ফসল উৎপাদনে ক্ষতির কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ, চাকিরপশারের স্বাভাবিক প্রবাহ শুধু মৎস্যজীবীদের জন্য নয়—কৃষক ও সামগ্রিক স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক জলাভূমি হিসেবে চাকিরপশারের রয়েছে জীববৈচিত্র্যগত গুরুত্ব। মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণী, জলজ উদ্ভিদ ও জলচর পাখির জন্য এ ধরনের জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সুপারিশে চাকিরপশারকে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলা, তীরভূমিতে বৃক্ষরোপণ এবং পাখির অভয়াশ্রম করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, জলাশয়টির পরিবেশগত সম্ভাবনাও সরকারি পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে। চাকিরপশার রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিএস মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী বিলকে দখলমুক্ত করা, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সড়ক ও পানি প্রবাহের ব্যবস্থা উন্নত করা। এ ছাড়া বিলের ইজারা বাতিল করে উন্মুক্ত জলাশয় হিসেবে সংরক্ষণ, মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা, তীরভূমিতে ওয়াকওয়ে ও বৃক্ষরোপণ এবং পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুপারিশও রয়েছে। চাকিরপশারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌকা, মাছ ধরা এবং জলচর পাখির উপস্থিতি এ এলাকার বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে চাকির পশার বিলকে পর্যটন স্পট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে পর্যটন উন্নয়নের আগে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা জরুরি। অপরিকল্পিত স্থাপনা বা পর্যটন অবকাঠামো যেন আবার জলপ্রবাহের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। স্থানীয় মানুষের কাছে চাকিরপশার শুধু একটি বিল নয়—এটি তাদের এলাকার পরিচয়ের অংশ। এ জলপ্রবাহের সঙ্গে মিশে আছে জেলে পরিবারের জীবিকা, কৃষকের ফসল, বর্ষাকালের স্মৃতি এবং স্থানীয় জনপদের ইতিহাস। তাই চাকিরপশারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু ইজারা বা মাছ চাষের বিষয়টি বিবেচনা না করে জলপ্রবাহ, মৎস্যসম্পদ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।


প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, অবৈধ দখল ও বাঁধ অপসারণ, মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং পরিকল্পিতভাবে পর্যটন উন্নয়ন করা গেলে চাকিরপশার আবারও রাজারহাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। চাকিরপশারের ইতিহাস তাই একটি বিলের ইতিহাস নয়, এটি একটি প্রাচীন জলপ্রবাহের ইতিহাস যে জলপ্রবাহ একসময় মাছ ও কৃষির জীবনরেখা ছিল, আর এখন নিজের অস্তিত্ব ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়।


নিউজটি আপডেট করেছেন : lifestyledesign847@gmail.com

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ